২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ১৩ মাসে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা মোট ৪ হাজার ৭০৭ কোটি টাকার লেনদেন করেছেন। এর মধ্যে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সর্বোচ্চ ৬৬৩ কোটি টাকার লেনদেন হলেও মে মাসে তা নেমে আসে মাত্র ৭৪ কোটি টাকায়।

পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মাসভিত্তিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বিদেশীদের লেনদেন ছিল ৪৯১ কোটি টাকা। আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ৩৭১ কোটি টাকায়। সেপ্টেম্বরে কিছুটা বেড়ে ৪৪০ কোটি টাকা হলেও অক্টোবরে আবার কমে হয় ৩৬৮ কোটি টাকা। এরপর নভেম্বর ও ডিসেম্বরে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বাজার কার্যক্রম আরো কমে যায়। নভেম্বরে তারা ২৬৭ কোটি ও ডিসেম্বরে মাত্র ১৪৬ কোটি টাকার লেনদেন করেন।

২০২৬ সালের শুরুতে অবশ্য বিদেশী বিনিয়োগকারীদের লেনদেনে কিছুটা গতি ফেরে। জানুয়ারিতে তাদের লেনদেন দাঁড়ায় ৩৭৭ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারিতে এক লাফে তা বেড়ে ৬৬৩ কোটি টাকায় ওঠে, যা আলোচ্য ১৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে মার্চে আবার কমে ২৭২ কোটি ও এপ্রিলে ১৭৫ কোটি টাকায় নেমে আসে।

মে মাসে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের লেনদেনে সবচেয়ে বড় ধস দেখা যায়। এ মাসে তাদের মোট লেনদেন ছিল মাত্র ৭৪ কোটি টাকা। তবে পরের দুই মাসে বাজারে তাদের কার্যক্রম আবার বাড়ে। জুনে বিদেশীদের লেনদেন বেড়ে ৫৪০ কোটি ও জুলাইয়ে ৫২৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

শুধু মাসভিত্তিক লেনদেনেই নয়, দেশের পুঁজিবাজার ও বন্ডবাজারে বিদেশী বিনিয়োগের নিট অবস্থানও কয়েক বছর ধরে নেতিবাচক। ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে দেশীয় ঋণ সিকিউরিটিজে বিদেশী বিনিয়োগের নিট প্রবাহ ঋণাত্মক হয়ে পড়ে। ওই অর্থবছরে নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগের বহিঃপ্রবাহ ছিল ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩ হাজার ৬০ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ৬৪০ কোটি ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৮২০ কোটি টাকায় পৌঁছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট পোর্টফোলিও বহিঃপ্রবাহ কিছুটা কমে ১ হাজার ৬৮০ কোটি টাকায় নেমে এলেও সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আবার বেড়ে ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে কয়েক বছর ধরে দেশের পুঁজিবাজার ও বন্ডবাজারে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নিট অবস্থান ধারাবাহিকভাবেই বহিঃপ্রবাহের দিকে রয়েছে।

এদিকে দীর্ঘমেয়াদেও দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে এক্সচেঞ্জটির মোট লেনদেনে বিদেশীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১৬ সালে ডিএসইতে বিদেশীদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৭৭৩ কোটি টাকা, যা ওই বছর এক্সচেঞ্জটির মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। ২০১৭ সালে বিদেশীদের লেনদেন বেড়ে ১১ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা হলেও মোট লেনদেনে তাদের অংশগ্রহণের হার কমে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে।

২০১৮ ও ২০১৯ সালে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ডিএসইতে যথাক্রমে ৯ হাজার ২৭৩ কোটি ও ৭ হাজার ৮২৩ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন করেন। এ দুই বছরে মোট লেনদেনে তাদের অংশগ্রহণের হার ছিল যথাক্রমে ৩ দশমিক ৪৮ ও ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

কভিডের বছর ২০২০ সালে ডিএসইতে বিদেশীদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা, যা এক্সচেঞ্জটির মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এরপর থেকেই বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে বড় ধরনের পতন দেখা যায়। ২০২১ সালে মোট লেনদেনে তাদের অংশগ্রহণের হার নেমে আসে ১ দশমিক ১০ শতাংশে এবং টাকার অংকে লেনদেন দাঁড়ায় ৭ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকায়।

২০২২ ও ২০২৩ সালে বিদেশীদের লেনদেন আরো তলানিতে নেমে যায়। এ দুই বছরে ডিএসইর মোট লেনদেনে বিদেশীদের অংশগ্রহণের হার ছিল যথাক্রমে দশমিক ৮৯ ও দশমিক ৭৭ শতাংশ। টাকার অংকে তাদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৪ হাজার ১৮০ কোটি ও ২ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে বিদেশীদের লেনদেন কিছুটা বেড়ে ৩ হাজার ৯২৯ কোটি টাকায় দাঁড়ালেও মোট লেনদেনে তাদের অংশগ্রহণের হার ছিল মাত্র ১ দশমিক ২২ শতাংশ।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশী বিনিয়োগকারীদের লেনদেনে এমন ওঠানামার পেছনে পুঁজিবাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি, শেয়ারদরের প্রবণতা, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সুযোগসহ বিভিন্ন বিষয় প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশী বিনিয়োগের নিট বহিঃপ্রবাহ এবং ডিএসইর মোট লেনদেনে তাদের অংশগ্রহণের হার কমে যাওয়ায় দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা এখনো আগের অবস্থানে ফেরেনি।