নড়াইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোটি টাকার সেচ প্রকল্প কৃষকের কোন কাজে আসছে না। এটি এখন শুধুই স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ আট বছর ধরে দুটি শক্তিশালী সেচপাম্প বিকল থাকায় সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এক হাজার হেক্টরের বেশি আবাদি জমি।
এছাড়া, প্রকল্পের খালগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় চিত্রা নদীর পানি আর জমিতে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে চড়া মূল্যে ডিজেল কিনে শ্যালোমেশিন চালাতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে কৃষকের।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসম্পদ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় ১৯৮৫ সালে নড়াইল সদর উপজেলার কমলাপুর ও গন্ধব্যখালী গ্রামে দুটি সেচ পাম্প বসানো হয়েছিল। এই প্রকল্পের আওতায় কমলাপুর এলাকায় সাড়ে আট কিলোমিটার দীর্ঘ সেচখাল খনন করা হয়।
এছাড়া গন্ধব্যখালী এলাকায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সেচখাল খনন করা হয়। খাল দুটি দিয়ে পানিপ্রবাহ সরাসরি কৃষকদের জমিতে পৌঁছায়। পাঁচ কোটি ১২ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে পরিচালিত প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল এক হাজার ৩৭ হেক্টর জমিতে কম খরচে কৃষকরা তাদের জমিতে সেচ সুবিধা পাবেন। কিন্তু ২০১৮ সালে সেচ পাম্প দুটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০১৯ সালে সেচপাম্প মেরামতের জন্য ৩৫ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে সেটি আর বাস্তবায়িত হয়নি।
কমলাপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সেচ প্রকল্পটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফটক নষ্ট, অফিস কক্ষে তালা এবং পুরো এলাকা মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত গেট অপারেটর ইয়ামিন তরফদার জানান, পাম্প বন্ধ থাকায় কর্মকর্তারা আসেন না, একা থাকার সুযোগে মাদকসেবীরা সেখানে ভিড় করে। আমাদের বাধা দেবার সাহস নেই।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, বর্তমানে ডিজেলচালিত শ্যালোমেশিনে এক কানি (৪০ শতাংশ) জমিতে সেচ দিতে ১০০ টাকা খরচ হচ্ছে। তবে এই সেচ প্রকল্পটি যখন চালু ছিল, তখন কম খরচে ধান, পাট, গমের জমিতে পানি দেওয়া যেত। এখন শ্যালোমেশিন দিয়ে পানি দিতে অনেক টাকা খরচ হচ্ছে তাদের।
কৃষক সৌমেন কুমার জানান, সেচপাম্প দুটি ছিল কম খরচে তাদের জন্য সহজ পানির উৎস। চিত্রা নদী থেকে সরাসরি জমিতে পানি সরবরাহ করা হতো এ সেচপাম্পের মাধ্যমে। ফলে তারা কম খরচে তিনটি ফসল উৎপাদন করার সুযোগ পেতেন। কিন্তু টানা আট বছর ধরে সেচ পাম্প দুটি বন্ধ রয়েছে। ফলে জমিতে সেচের জন্য এখন ডিজেল চালিত শ্যালো মেশিনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের।
কমলাপুর গ্রামের মিলন ঘোষ বলেন, একসময় সেচপাম্প থেকে জমিতে বিনামূল্যে সেচ সুবিধা পেতাম। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড সমিতি চালু করে। এরপর বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার অজুহাতে টাকা নেওয়া শুরু করে। তখন বিদ্যুৎ বিল বাবদ তিন শতক জমিতে ৯ টাকা দিতাম। পরে জানতে পারলাম বিদ্যুৎ বিল হাজার হাজার টাকা বাকি পড়ে গেছে। তারপর থেকে সেচ দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এখন শুনছি পাম্প নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।
এক একর জমিতে এ বছর ধানের আবাদ করেছেন সদর উপজেলার আউড়িয়া ইউনিয়নের নাকশি গ্রামের মাসুম খন্দকার। ডিজেলচালিত শ্যালোমেশিন চালিয়ে নিজ জমিতে সেচ দিচ্ছিলেন তিনি। তিনি বলেন, সেচপাম্প চালু থাকায় তিন গ্রামের কৃষক কম খরচে ধান, পাট, গম ও অন্যান্য ফসলের জন্য জমিতে সেচ দিতে পারতেন। পাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিন গ্রামের কৃষকের উৎপাদন খরচ ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে।
এ বিষয়ে নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার সাহা বলেন, প্রকল্পটির অধীনে দুইটি সেচ পাম্প ছিল। সেচ পাম্প দুটি বিকল হয়ে যাওয়ায় তা মেরামতের জন্য ২০১৮ সালে ঢাকায় প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে সেটি বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি বলেন, প্রকল্পটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। এটি পুনরায় চালু করতে পারলে ওই এলাকার কৃষি জমিতে কৃষকরা কম খরচে সেচ সুবিধা পাবে। অকেজো হয়ে পড়ে থাকা সেচপাম্প দুটি নতুন করে সংস্কারের জন্য পুনরায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের চাহিদা পাঠানো হয়েছে।