জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী এ শতাব্দীর একটি ঐতিহাসিক সাংবিধানিক পরিবর্তন হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন।
বুধবার ৫ আগষ্ট রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বুধবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত শহিদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে বিভাজনের রাজনীতি নয়, বরং জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন। জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অক্ষর বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সে লক্ষ্যেই সংবিধান সংশোধনের কাজ এগিয়ে চলছে।
তিনি আরও বলেন, “আমরা এই জুলাইকে নিয়ে রাজনীতি কেন করব?… একটা স্বৈরাচারের কবল থেকে মুক্তির পরে আমরা যদি বলি, ‘জুলাই কার, জুলাই কার?’ তাহলে জুলাই আমাদের কারোরই থাকবে না। এই অবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হবে।”
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পৃথিবীর অনেক জাতি শতবর্ষ সংগ্রাম করেও স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু বাংলাদেশ এমন একটি ঐতিহাসিক সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে, যেখানে কয়েক সপ্তাহেই যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে।
ভ্লাদিমির লেনিনের একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কোনো কোনো দশক আছে যেখানে কিছুই ঘটে না, আবার কোনো কোনো সপ্তাহ আছে যেখানে কয়েক দশকের ইতিহাস রচিত হয়। আমরা সেই ইতিহাসের সাক্ষী।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি হিসেবে দেখার বিরোধিতা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই আমাদের সবার। বাংলাদেশের ১৮ কোটি, ২০ কোটি মানুষের, সবার। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা কেউ কেউ হয়তো নেতৃত্ব দিয়েছি, কিন্তু সামনের সারিতে যারা শহিদ হয়েছেন, তারাই আসল জুলাই যোদ্ধা, আসল নেতা। তাদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করাই হবে আমাদের জন্য ফরজ।’
তিনি আরও বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটির প্রথম বৈঠক ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সব রাজনৈতিক পক্ষকে এতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তার ভাষায়, ‘জুলাই জাতীয় সনদের প্রত্যেকটা অক্ষর বাস্তবায়ন করা হবে, আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।’
সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সংবিধান সংশোধনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই হচ্ছে অ্যামেন্ডমেন্ট। প্রত্যেকটা অ্যামেন্ডমেন্ট হচ্ছে এক একটি সংস্কার।… সেটা গ্রহণ করতে হবে পার্লামেন্টে।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সংস্কার কমিশন বা রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি বাস্তব পরিবর্তনের জন্য সংসদে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী গ্রহণ করা প্রয়োজন। এটি হবে শতাব্দীর সবচেয়ে ঐতিহাসিক সংশোধনী। যেটার প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের শহিদরা শহিদ হয়েছেন, যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, যার জন্য আমরা সংগ্রাম করেছি…তাকে আমি বৃথা যেতে দেব না।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন আগামী সংসদে উত্থাপন করা হবে। তিনি বলেন, ‘গুম কমিশন আমরা অধ্যাদেশ পাস করি নাই, কিন্তু গুমের ওপর প্রতিকার ও গুম প্রতিরোধ আইন নিয়ে এসেছি। আগামী পার্লামেন্টে আসবে ইনশাআল্লাহ।…সিস্টেমেটিক এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সের জন্য মৃত্যুদণ্ডসহ কড়া শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।’
জুলাই আন্দোলনের পটভূমি তুলে ধরে তিনি বলেন, এই গণঅভ্যুত্থান ৩৬ দিনের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ফল।
তিনি আরও বলেন, ‘এই মুক্তির মন্দিরের সোপান এক দিনে নির্মিত হয়নি। এই সোপান নির্মিত হয়েছে ২০০৯ থেকে শুরু করে ২০২৪ পর্যন্ত।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও গণতন্ত্রকামী মানুষ গুম, খুন, নির্যাতন ও মামলার শিকার হয়েছেন। সেই ইতিহাস বাদ দিয়ে জুলাইকে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো আন্দোলন রক্তাক্ত হবে কি হবে না, সেটা সাধারণ মানুষ নির্ধারণ করে না। সেটা নির্ধারণ করে দিয়েছে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা। আমাদের ছেলেরা-মেয়েরা শূন্য হাতে প্রতিবাদ করেছে, শহিদ হয়েছে, তারপর গণঅভ্যুত্থান হয়েছে।’
জুলাইয়ের চেতনাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘৭১-এর চেতনাকে বিক্রি করতে করতে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা দিল্লিতে গিয়ে বসে আছে।…আমরা যেন জুলাইয়ের এই চেতনাকে কোনোদিন অসম্মান না করতে হয়, সেই রকম রাজনীতি করি।’
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘সাংবাদিক বন্ধুদের প্রত্যাশা কী, আইনজীবীদের প্রত্যাশা কী, বিশেষজ্ঞদের মতামত কী—সবাইকে নিয়ে আমরা এমন একটি সংবিধান সংশোধনী আনতে চাই, যেটা নিয়ে আমরা অনেক বছর চলতে পারব। কারণ বারবার জুলাই আসে না, বারবার ৭১ আসে না, বারবার বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান হবে না।’
জুলাই যোদ্ধা ও শহিদ পরিবারের পুনর্বাসনের বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আহতদের ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী পৃথক শ্রেণিবিন্যাস করে সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যারা এখনও তালিকাভুক্ত হতে পারেননি, তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
আওয়ামী লীগের বিচার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনগত ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসেবে বিচার সুগম করার জন্য কনস্টিটিউশন আর্টিকেল ৪৭-এর অনুসরণে আমরা আইন সংশোধন করেছি।…ব্যক্তির মতো সংগঠনেরও বিচার করা যায়। আদালত নির্ধারণ করবে আওয়ামী লীগের পরিণতি কী হবে।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা এক্সিকিউটিভ অর্ডারে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নই। কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়ায় অবশ্যই আদালত নির্ধারণ করবে আওয়ামী লীগের কী হবে।…ইনশাআল্লাহ, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে এবং তাদের বিচার নিশ্চিত করা হবে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ গণহত্যাকারী কোনো মাফিয়া শক্তিকে এই দেশে রাজনীতি করার জন্য আর অনুমতি দেবে না।’
শেষে তিনি বলেন, ‘আমরা পরস্পর তর্ক করব, বিতর্ক করব। জাতীয় সংসদে সরকারি দল-বিরোধী দল বাহাস করব। কিন্তু যখন আওয়ামী লীগের প্রশ্ন আসবে, তখন সমগ্র জাতি এক থাকবে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জীবন্ত সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। ‘কোনো সরকার যাতে ফ্যাসিবাদী আচরণ না করে, সেই জন্য জুলাই জাদুঘর রেখে এসেছি। ওখানে গিয়ে সবাই শিক্ষা নিয়ে আসবে। সেটাকে আমরা জীবন্ত জাদুঘর হিসেবে রেখে দেব।’